ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা কিংবা জাপানের টোকিওর তুলনায় ঢাকার জীবনমানের ব্যবধান বেশ স্পষ্ট। তবু জনসংখ্যার বিচারে ঢাকা এখন এই দুই শহরের সঙ্গেই একই তালিকায় অবস্থান করছে। ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এই শহরে বায়ুদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু কমছে, অধিকাংশ মানুষের আয়ও মাত্র চলনসই পর্যায়ে। তারপরও প্রতিবছর এই শহরে মানুষের ভিড় বাড়ছে।
কেন বাড়ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো অনেকের কাছেই পরিচিত। তবু আগ্রহ থেকে যায়—আসলে কোন প্রক্রিয়ায় এই চক্রটি চলছে। বিষয়টি বুঝতে প্রথমে একটি তত্ত্বের সাহায্য নেওয়া যাক। ‘ক্লাস, স্ট্যাটাস, পার্টি’ নামের এই ধারণার প্রবক্তা জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার। তাঁর মতে, মানুষের স্থানান্তর মূলত তিনটি বিষয় দ্বারা নির্ধারিত হয়—ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থান (ক্লাস), আধুনিক জীবনধারা (স্ট্যাটাস) এবং ক্ষমতা চর্চার সুযোগ (পার্টি)। এই তিনটি যেখানে বেশি থাকে, মানুষ সেদিকেই ধাবিত হয়।
প্রশ্ন হলো, যে আশায় মানুষ ঢাকায় ছুটে আসছে, সেই আশা পূরণের বর্তমান চিত্রটি আসলে কেমন? ২০৫০ সাল নাগাদ এই শহরের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৫ কোটি ২১ লাখে। নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যতে কী হতে পারে? বিকেন্দ্রীকরণের পথ-ই বা কতটা খোলা? আর এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্য শহরগুলো কী করেছে?
কী কারণে কত মানুষ বাড়ছে
বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মেয়রদের একটি জোট রয়েছে, নাম মেয়রস মাইগ্রেশন কাউন্সিল (এমএমসি)। তাদের হিসাবে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে—বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে—প্রতিদিন ঢাকায় নতুন করে ২ হাজার মানুষ যুক্ত হয়। বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের ৬৬ দশমিক ২ শতাংশের লক্ষ্য থাকে ভালো বেতনের চাকরি ও তুলনামূলক উন্নত জীবনযাপন। ঢাকা শহরের ক্ষেত্রেও এই চিত্র একই রকম।
২০২৪ সালে পিপলস কারেজ ইন্টারন্যাশনাল এবং দ্য অ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট (এসিডি) একটি জরিপের তথ্য প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ৭১ শতাংশ অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর ঘটে কর্মসংস্থানের অভাবে এবং ৬৯ শতাংশ মানুষ স্বল্প মজুরির কারণে শহরমুখী হতে বাধ্য হন।
ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্স ফর অল নামের একটি সংস্থার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অন্য জেলা থেকে ঢাকায় এসেও মানুষ একই ধরনের সমস্যায় পড়ছেন—উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে জীবনযাপন ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় বলা হয়, ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বেড়েছে ৭ গুণ এবং ভূমির তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ঢাকায় জীবিকার চিত্র
জাতিসংঘ তাদের প্রতিবেদনে শহর হিসেবে ঢাকার আশপাশের এলাকাকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাই জীবিকার বর্তমান চিত্র বুঝতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি জরিপের দিকে নজর দেওয়া যাক। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, দেশে সবচেয়ে বেশি বেকার ঢাকা বিভাগে—৬ লাখ ৮৭ হাজার জন। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকার প্রায় ২০ লাখ, যাদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী।
এসব সংখ্যাগত তথ্যের মূল নির্যাস হলো, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক লাখ তরুণ-তরুণী এই শহরে পাড়ি জমান। আবার শিল্প-কারখানা ও বহুজাতিক কোম্পানির উপস্থিতির কারণে পড়াশোনা শেষে অধিকাংশই ঢাকাতেই থেকে যান। তবে অর্থনৈতিক মন্দা ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের কারণে চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতায় অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রায়ই তুলনামূলক কম বেতনের চাকরিতে ঢুকতে বাধ্য হচ্ছেন।
ম্যাক্স ওয়েবারের তত্ত্ব ধরে বলা যায়, ব্যক্তির ক্লাস ও স্ট্যাটাস সম্পর্কিত ভাবনাই তাঁকে ঢাকায় থাকতে বাধ্য করছে। এই হিসাবে গড় আয়ু কমে যাওয়ার পরিসংখ্যানও তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের (একিউএলআই) ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা এবং পাশের নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মতো সবচেয়ে দূষিত এলাকায় বসবাসকারী মানুষের আয়ু কমছে গড়ে সাড়ে ৬ বছর।
ঢাকায় জনস্রোতের সবশেষ চিত্র
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ‘বৈশ্বিক নগরায়ণ ধারণা-২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ। বিশ্বে ঢাকার ওপরে আছে শুধু ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা—৪ কোটি ১৯ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে। তৃতীয় স্থানে থাকা জাপানের টোকিওর বাসিন্দা ৩ কোটি ৩৪ লাখ।
আয়তনের হিসাবে ঢাকার চেয়ে জাকার্তা প্রায় দ্বিগুণ বড়—৬৬২ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার। আর টোকিওর আয়তন প্রায় ২ হাজার ১৮৭ দশমিক ৬৬ বর্গকিলোমিটার। জাতিসংঘের মতে, ঢাকার তুলনায় এই দুই শহরের জনসংখ্যা ২০৫০ সাল নাগাদ অপেক্ষাকৃত নিয়ন্ত্রিত হারে বাড়বে। তখন মাত্র ৩৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ঢাকা হয়ে উঠবে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার। ২০০০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ। অর্থাৎ, ২৫ বছরে তা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে ঢাকা জনসংখ্যায় শীর্ষে উঠে আসবে।
জাতিসংঘ ঢাকার কতটুকু এলাকা ধরে এই জনসংখ্যার হিসাব করেছে, তা বোঝা যায় তাদের শহরের সংজ্ঞা থেকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহর বলতে এমন সব ভৌগোলিক অঞ্চলকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০ জন এবং মোট জনসংখ্যা কমপক্ষে ৫০ হাজার। এই সংজ্ঞা নেওয়া হয়েছে বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত ‘ডিগ্রি অব আরবানাইজেশন’ পদ্ধতি থেকে, যেখানে শহর বলতে নগর সমষ্টিকে বোঝানো হয়। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, ঢাকার আশপাশের এলাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধিও ঢাকা শহরের হিসাবেই গণ্য হয়।
ভবিষ্যৎ কেমন হবে
স্বয়ংক্রিয়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে ভবিষ্যতের শ্রমবাজার আরও দ্রুত পরিবর্তনশীল হবে। ঢাকায় যদি কেবল একই ধরনের সেবামূলক খাত বা ঐতিহ্যবাহী শিল্প গড়ে উঠতে থাকে, তাহলে চাকরির বাজার আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়বে।
এর বড় প্রভাব পড়তে পারে জীবনমানের ওপর। অর্থনীতির চাহিদা-জোগানের সূত্র ধরে বলা যায়, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ যেমন কঠিন হবে, তেমনি আবাসন খাতে ভাড়াও বাড়বে। গণপরিবহন খাতও আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আর এই চক্রের প্রভাব ঘুরে ফিরে জাতীয় উন্নয়নকেই বাধাগ্রস্ত করবে—অনেকটা যানজটের মতো। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) এক সেমিনারে জানানো হয়, ঢাকায় যানজটে দিনে নষ্ট হয় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, ঢাকা যদি পরিকল্পনাহীনভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি আজকের চেয়ে দ্বিগুণ হবে। ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড, বন্যা, গৃহহীনতা ও কর্মসংস্থানের সংকট—সবই তখন আরও বাড়বে।
জাকার্তা ও টোকিও যা করছে
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে মোট কর্মসংস্থানের এক-তৃতীয়াংশেরও কম কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক এলাকায় অবস্থিত। ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সৃষ্ট নতুন কর্মসংস্থানের অর্ধেকেরও বেশি ছিল শহরতলিতে। ফ্রান্সের প্যারিস ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে দৈনিক যাতায়াতের প্রায় ৩০ শতাংশ শহরকেন্দ্রের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় কর্মক্ষেত্রগুলোর বেশির ভাগই সেখানে শহরতলিতে ছড়িয়ে রয়েছে।
জনসংখ্যা বিস্ফোরণের কারণে ইন্দোনেশিয়ার সরকার জাকার্তা থেকে রাজধানী সরিয়ে নিচ্ছে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দূরের বোর্নিও দ্বীপে। ২০১৯ সাল থেকে নুসানতারা নামের নতুন রাজধানী নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে, যেখানে দেশটির প্রেসিডেন্টের দপ্তর, সরকারি প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়গুলোর কেন্দ্র স্থাপিত হবে। অন্যদিকে ২০১৫ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে একটি কর্মসূচি চালু করেন, যার আওতায় টোকিও থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে জনসংখ্যা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের ভাষ্যে, বাংলাদেশেও বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে সব সময় আলোচনা হয়, কিন্তু বাস্তবে ঘটছে তার উল্টোটা।
এই নগর পরিকল্পনাবিদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। চট্টগ্রাম, যশোর, কুমিল্লা, সিলেট, রংপুর ও বরিশাল—প্রতিটি জায়গাতেই সম্ভাবনা রয়েছে। যদি এখনই বিকেন্দ্রীকরণ, পরিকল্পিত নগরায়ণ, নিরাপদ আবাসন এবং কর্মসংস্থানের সমান্তরাল নীতি গ্রহণ করা যায়, তাহলে আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরে ঢাকাকে চাপমুক্ত করা সম্ভব হবে।