ভারতের তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে সিনেমার তারকাদের প্রভাব নতুন কিছু নয়। কয়েক দশক ধরে একাধিক জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী রুপালি পর্দা ছেড়ে রাজ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তারই সর্বশেষ উদাহরণ জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর, যিনি তামিল চলচ্চিত্রে পরিচিত থালাপতি বিজয় নামে।
বর্তমানে তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন থালাপাতি। অথচ, তিনি রাজনৈতিক দল খুলেছেনই ২০২৪ সালে। এর এক বছর পরই রাজ্যে নির্বাচন এবং সেখানে জয় নিয়ে থালাপাতির জয়জয়কার।
বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা
আইএমডিবির তথ্য অনুযায়ী, বিজয়ের সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘দ্য গ্রেটেস্ট অব অলটাইম’ (জিওএটি) মুক্তি পায় ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। এর প্রায় ছয় বছর আগে, ২০১৮ সালে মুক্তি পায় তাঁর সিনেমা ‘সরকার’, যেখানে তিনি একজন ব্যবসায়ীর রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সিনেমাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি এতে ওই চরিত্রের নির্বাচনে জয়লাভের কাহিনিও দেখানো হয়েছিল।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিজয় নিজের রাজনৈতিক দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজগাম’ (টিভিকে) গঠন করেন। এরপর থেকেই তাঁর বাস্তব রাজনৈতিক যাত্রাকে অনেকে ‘সরকার’ সিনেমার গল্পের সঙ্গে তুলনা করে আসছিলেন।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দল গঠনের ঘোষণার পর বেশ কিছুদিন প্রকাশ্যে অপেক্ষাকৃত নীরব ছিলেন বিজয় ও তাঁর দলের নেতারা। তাঁরা এমন একটি সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন, যখন জনসাধারণের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সাড়া পাওয়া সম্ভব হবে। সেই মুহূর্তটি আসে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। জিওএটি সিনেমা মুক্তির মাত্র কুড়ি দিন পর, ২৫ সেপ্টেম্বর তামিলনাড়ুর কেন্দ্রস্থল ত্রিচি শহরে বিজয় তাঁর প্রথম বড় রাজনৈতিক সমাবেশ করেন। সিনেমা মুক্তির জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েই ইচ্ছাকৃতভাবে এই সমাবেশের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
সিংহের হুংকার
২০২৫ সালের আগস্টে তামিলনাড়ুর মাদুরাই শহরে এক মহাসমাবেশে বিজয় ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় আক্রমণ চালান এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশাসনকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে অভিহিত করেন। এই বক্তব্য বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপক গুরুত্ব পায়।
ওই সমাবেশে বিজয় বিজেপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘জঙ্গলে অনেক শিয়াল থাকে, কিন্তু সিংহ থাকে মাত্র একটি। সিংহ জানে কীভাবে টিকে থাকতে হয়।’
করুরের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা
তামিলনাড়ুতে বিধানসভা নির্বাচন হয় ২০২৬ সালের এপ্রিলে। নির্বাচনের প্রচারের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, শনিবার তামিলনাড়ুর করুর জেলায় একটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ কর্মকর্তা ও বিজয়ের ঘনিষ্ঠজনদের বরাত দিয়ে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, ওই সমাবেশে থালাপাতির বক্তৃতা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই পদদলনের ঘটনা ঘটে এবং পুরো পরিস্থিতি মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নেয়। গাছে ওঠা কয়েকজন ভক্ত ডাল ভেঙে জনতার মধ্যে পড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, বিজয়কে একনজর দেখার জন্য মানুষ প্রচণ্ড হুড়োহুড়ি শুরু করে, যার একপর্যায়ে কয়েকজন অচেতন হয়ে পড়েন। তীব্র গরম ও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেকে দমবন্ধ পরিস্থিতিতে পড়েন। এ সময় বিজয় বক্তৃতা থামিয়ে জনতার দিকে পানির বোতল ছুঁড়ে দেন এবং পরে আবার বক্তৃতা শুরু করেন। তবে ততক্ষণে পদদলনের ঘটনা ঘটে যায়।
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমাবেশস্থলে প্রায় ১০ হাজার মানুষ ধারণক্ষমতা থাকলেও সেখানে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় ২৭ হাজার মানুষ। সমাবেশ বিকেলে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বিজয় পৌঁছান সন্ধ্যার দিকে, যার ফলে জনসমাগম আরও বেড়ে যায়। এই দুর্ঘটনায় অন্তত ৪১ জনের মৃত্যু হয় এবং শতাধিক মানুষ আহত হন।
বিজয়ের বিজয়
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দুর্ঘটনার পর বিজয়ের জন্য নির্বাচনে জেতা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পরে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, দুর্ঘটনার পর অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তাঁদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, এত বড় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির খবর জানার পরও বিজয় নীরবে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
দুর্ঘটনার পর তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন করুরে গিয়ে শোকাহত পরিবারগুলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে সাংবাদিকরা তাঁকে এমন প্রশ্নও করেন যে, এই ঘটনায় বিজয়কে গ্রেপ্তার করা হবে কি না।
প্রশাসনিক তৎপরতাও থেমে থাকেনি। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানানো হয়। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত বিজয়কে গ্রেপ্তারের কোনো পরিকল্পনা তারা করেনি। কারণ, সেটা হলে বিজয়ের প্রতি জনসমর্থন আরও বেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করেছিলেন তার বিরোধীরা।
কিন্তু, নির্বাচনে শেষ হাসিটা ছিল বিজয়েরই। তিনি বিজয় পান এবং নতুন মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব ভার সামলান।
তামিল সিনেমা ও রাজনীতির পুরোনো সম্পর্ক
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে সিনেমার তারকাদের প্রভাব বহু পুরোনো এবং গভীর। দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যে চলচ্চিত্র তারকাদের প্রায় দেবতুল্য মর্যাদা দেওয়ার একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, যার শিকড় প্রাচীন তামিল বীরপূজার ধারণার মধ্যে নিহিত। এই সাংস্কৃতিক প্রবণতার কারণেই বহু জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী পরবর্তী সময়ে সফল রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছেন।
এই ধারার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এম জি রামচন্দ্রন, যিনি এমজিআর নামে পরিচিত। ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে ডিএমকে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি ১৯৭২ সালে নতুন দল অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজগাম (এআইএডিএমকে) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন।
এমজিআরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করেন অভিনেত্রী জে জয়ললিতা, যিনি এমজিআরের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন। এমজিআরের মৃত্যুর পর তিনি এআইএডিএমকের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং একাধিকবার তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে তাঁর মৃত্যু হয়।
উল্লেখ্য, ডিএমকের সাবেক প্রধান ও তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম করুণানিধি নিজে অভিনেতা না হলেও একজন প্রখ্যাত তামিল চিত্রনাট্যকার ছিলেন এবং সিনেমাশিল্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁর রাজনৈতিক উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনও তরুণ বয়সে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
আরও সাম্প্রতিক উদাহরণের মধ্যে রয়েছেন অভিনেতা বিজয়কান্ত, যিনি ২০০৫ সালে দেশীয় মুরপক্কু দ্রাবিড় কাজগাম (ডিএমডিকে) দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ২০১১ সালের নির্বাচনে তাঁর দল রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা অর্জন করে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তাঁর মৃত্যু হয়।
তামিল সিনেমার আরেক জনপ্রিয় অভিনেতা কমল হাসান ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মক্কাল নিধি মাইয়াম (এমএনএম) দল গঠন করেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি কোয়েম্বাটুর দক্ষিণ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তবে বিজেপি প্রার্থী বনাথি শ্রীনিবাসনের কাছে মাত্র দেড় হাজারের কিছু বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।
অন্যদিকে, তামিল সিনেমার আরেক কিংবদন্তি অভিনেতা রজনীকান্ত ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে পরবর্তী কয়েক বছর তিনি একাধিকবার তাঁর পরিকল্পনা স্থগিত রাখেন এবং শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালের ডিসেম্বরে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে না আসার সিদ্ধান্ত জানান।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে সিনেমার তারকাদের এই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিজয়ের যাত্রা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এমজিআর ও জয়ললিতা যেখানে সফলভাবে ক্ষমতায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন, সেখানে কমল হাসান ও রজনীকান্তের মতো তারকারা ব্যাপক জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি। করুরের দুর্ঘটনার পর বিজয়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি হলেও সেটা তিনি মোকাবিলা করতে পেরেছেন এবং নিচের বিশাল জনপ্রিয়তার ধাক্কায় সেই চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে গেছেন।