যারা নিয়মিত মাদক বা অ্যালকোহল গ্রহণ করেন, তাদের শরীরে ওই নেশাজাতীয় পদার্থের কিছুটা হলেও থেকে যায়। সেটা পরীক্ষার জন্য যে মেডিকেল পরীক্ষা করা হয় তাকেই ডোপ টেস্ট বলে।
এ ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির মূত্র বা রক্ত, আবার কখনো দুটির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। মাদক গ্রহণ করা ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শেষ ১ সপ্তাহে মুখের লালার মাধ্যমে, শেষ ২ মাস রক্তের মাধ্যমে, শেষ ১২ মাস বা ১ বছরে চুল পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া যায় মাদকের নমুনা।
ডোপ টেস্টের ফলাফল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে এর ফল ‘নেগেটিভ’ বা নেতিবাচক আসার অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কখনো মাদক গ্রহণ করেননি। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। মাদক বিজ্ঞান ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ডোপ টেস্টের ফল ব্যাখ্যা করতে হলে নমুনা সংগ্রহের সময়, নমুনার ধরন এবং পরীক্ষিত মাদকের প্রকৃতি—এই বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
‘নেগেটিভ’ ফল আসলে কী বোঝায়
ডোপ টেস্টে ফল ‘নেগেটিভ’ হওয়ার অর্থ সব সময় এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কখনো মাদক নেননি। সহজভাবে এর অর্থ হলো, নমুনাটি যখন পরীক্ষা করা হয়েছে, তখন পরীক্ষিত মাদক বা তা থেকে তৈরি হওয়া উপাদান শরীরে শনাক্ত করার মতো পরিমাণে পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের ‘জৈব নমুনায় মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণ পরীক্ষা (ডোপ টেস্ট) বিধিমালা, ২০২৬’-এ ‘মিথ্যা নেতিবাচক’ ফলের সংজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে। বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি মাদক গ্রহণ করে থাকলেও পরীক্ষার সময় তাঁর জৈব নমুনায় মাদক বা তার বিপাকজাত পদার্থ পরীক্ষাগারের নির্ধারিত মাত্রার নিচে থাকলে ফল নেতিবাচক আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নেতিবাচক ফল যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করতে অন্তত চারটি বিষয় জানা প্রয়োজন—কোন মাদক পরীক্ষা করা হয়েছে, সেবনের কত দিন পর নমুনা নেওয়া হয়েছে, কী ধরনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে এবং পরীক্ষাটির শনাক্তকরণ সীমা কত ছিল।
সেবনের কত দিন পর্যন্ত মাদক শনাক্ত হয়
মাদক সেবনের পর তা শরীরে কতদিন শনাক্তযোগ্য থাকে, সেটি নির্ভর করে মাদকের ধরন, সেবনের মাত্রা, ব্যক্তির বিপাকক্রিয়া এবং পরীক্ষার নমুনার প্রকারের ওপর।
উদাহরণস্বরূপ, ইয়াবার প্রধান সক্রিয় উপাদান মেথামফেটামিন সাধারণভাবে মূত্রে দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত শনাক্তযোগ্য থাকে। তবে নিয়মিত সেবন, ব্যক্তির বিপাকক্রিয়া, মূত্রের অম্ল-ক্ষার মাত্রা এবং পরীক্ষাপদ্ধতির শনাক্ত সীমার কারণে এই সময় কিছুটা কমবেশি হতে পারে।
বিভিন্ন মাদক নিয়ে বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একবার মাদক গ্রহণের পর মূত্রে অধিকাংশ মাদকের শনাক্তকাল সাধারণত দেড় থেকে চার দিনের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে সেবনকারীদের ক্ষেত্রে কিছু মাদক এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় পরও শনাক্ত হতে পারে।
অর্থাৎ মাদক সেবনের বেশ কিছুদিন পর নমুনা সংগ্রহ করা হলে, সেবিত মাদক শনাক্ত না হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার নেতিবাচক ফলাফল দিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে ব্যক্তি ওই সময়ে মাদক সেবন করেননি।
মূত্র, রক্ত, লালা, চুল—কোনটি কখন কাজে লাগে
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ২৪ ধারায় তদন্ত বা তল্লাশির প্রয়োজনে বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা করানোর বিধান রয়েছে। একই ধারার ৪ উপধারায় মাদকাসক্ত ব্যক্তি শনাক্ত করতে বিধি অনুযায়ী ডোপ টেস্ট করার কথা বলা হয়েছে।
এই আইনের ভিত্তিতে সরকার ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ‘জৈব নমুনায় মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণ পরীক্ষা (ডোপ টেস্ট) বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করে।
বিধিমালায় জৈব নমুনার সংজ্ঞার মধ্যে মূত্র, লালা, রক্ত, চুল, নখ ও নিশ্বাসের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী অঙ্গ, অঙ্গের অংশ ও অন্যান্য দেহ তরলও রাখা হয়েছে। তবে মূত্র, রক্ত, লালা, চুল ও নখ সংগ্রহের পৃথক পদ্ধতি সুনির্দিষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মূত্র: কয়েক দিন আগের মাদক সেবন শনাক্ত করতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নমুনাগুলোর একটি। মেথামফেটামিন সাধারণভাবে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে শনাক্ত হতে পারে। তবে মূত্রে মাদক পাওয়া গেলেও ব্যক্তি ঠিক কখন তা সেবন করেছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না।
রক্ত: মাদক সেবনের সঙ্গে সময়গত সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। বেলজিয়ামের গেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যালাইন ভার্সট্রেটের এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, রক্ত বা রক্তরসে অধিকাংশ মাদক সাধারণত এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত শনাক্ত হতে পারে। তবে মাদকভেদে এই সময় অনেক কমও হতে পারে।
লালা: খুব সাম্প্রতিক সেবন শনাক্ত করতে কার্যকর। সাধারণভাবে বিভিন্ন মাদক লালায় ৫ থেকে ৪৮ ঘণ্টা শনাক্ত হতে পারে। তবে অতিমাত্রায় ও দীর্ঘদিন ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমীভাবে আরও দীর্ঘ সময় শনাক্ত হওয়ার তথ্যও গবেষণায় পাওয়া গেছে।
চুল: মূত্র, রক্ত বা লালার তুলনায় অনেক দীর্ঘ সময়ের মাদক ব্যবহারের ইতিহাস জানাতে পারে চুল। মাদক চুলে পৌঁছে পরীক্ষাযোগ্য অংশ হিসেবে বেরিয়ে আসতে কিছুটা সময় লাগে। এ কারণে একেবারে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের সেবনের তথ্যের জন্য চুল ভালো নমুনা নয়। সাধারণত এক সপ্তাহ পর থেকে কয়েক মাস আগের মাদক ব্যবহারের ইতিহাস জানতে চুলের নমুনা কাজে লাগতে পারে।
নখ: চুলের মতো নখও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের তথ্য দিতে পারে। একটি বড় গবেষণায় মাদক গ্রহণের তিন থেকে ছয় মাস পরও নখে মাদক শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে নখে কোন মাদক কত দিন পরও নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত হবে, এমন সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়।
অর্থাৎ কোন নমুনাটি ‘সবচেয়ে ভালো’, তার একক কোনো উত্তর নেই। কোন সময়ের মাদক সেবন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করেই নমুনা নির্বাচন করতে হয়।
সব মাদকের শনাক্তকাল এক নয়
ডোপ টেস্ট নিয়ে বিভ্রান্তির আরেকটি বড় কারণ হলো, সব মাদক শরীর থেকে একই গতিতে বের হয় না। মেথামফেটামিন মূত্রে সাধারণত কয়েক দিন শনাক্ত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন গাঁজা সেবনকারীর ক্ষেত্রে গাঁজার প্রধান সক্রিয় উপাদান টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনলের (টিএইচসি) বিপাকজাত পদার্থ মূত্রে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত শনাক্ত হতে পারে। অন্যদিকে কিছু মাদকের বিশেষ বিপাকজাত পদার্থ মাত্র কয়েক ঘণ্টা শনাক্তযোগ্য থাকে।
এ কারণে শুধু ‘তিন দিন পর পরীক্ষা’ বা ‘সাত দিন পর পরীক্ষা’—এমন তথ্য দিয়ে পরীক্ষাটি যথাসময়ে হয়েছে কি না, তা বলা যায় না। কোন মাদক খোঁজা হচ্ছে, তা আগে জানা প্রয়োজন।
আবার একটি ডোপ টেস্ট দিয়ে সব মাদকের অস্তিত্ব একসঙ্গে প্রমাণ করা যায় না। ডোপ টেস্টের বিধিমালায় প্রাথমিক পরীক্ষার নির্ধারিত প্রতিবেদনে আলাদাভাবে অপিওয়েডস, মেথামফেটামিন, ক্যানাবিনয়েডস, বেনজোডায়াজেপিন ও অ্যালকোহল পরীক্ষার ঘর রাখা হয়েছে। এর বাইরে ‘অন্যান্য’ মাদকের জন্যও আলাদা ঘর রয়েছে।
অর্থাৎ শুধু ‘ডোপ টেস্ট নেগেটিভ’ বললেই তথ্যটি সম্পূর্ণ হয় না। জানতে হবে, কোন কোন মাদক বা মাদকশ্রেণি শনাক্ত করার জন্য পরীক্ষা করা হয়েছিল।
সাধারণ পরীক্ষায় একটি মাদকশ্রেণির কিছু উপাদান শনাক্ত হলেও একই গোত্রের অন্য কোনো মাদক ধরা না-ও পড়তে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাদকের জন্য আলাদা পরীক্ষা করতে হয়।
ডোপ টেস্ট সাধারণত দুই ধাপে সম্পন্ন হয়—প্রাথমিক শনাক্তকরণ পরীক্ষা এবং নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা। ২০২৬ সালের বিধিমালা অনুযায়ী, প্রাথমিক পরীক্ষায় স্বীকৃত পরীক্ষা যন্ত্র, কিট বা ফিতা ব্যবহার করা যায়। এই পরীক্ষায় ফল ইতিবাচক এলে একই নমুনা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতিতে নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা করতে হয়। তাই শুধু প্রাথমিক পরীক্ষার ইতিবাচক ফলকে চূড়ান্ত বলে ধরা যায় না।
নমুনা সংগ্রহেও প্রয়োজন সতর্কতা
মূত্রের নমুনা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পাত্রে সংগ্রহ করতে হয়। নমুনা সংগ্রহের আগে হাত ধুতে হয় এবং পাত্রের মুখ এমনভাবে বন্ধ করতে হয়, যাতে তা বিকৃত বা পরিবর্তন করা না যায়।
নিয়ম অনুযায়ী, রক্তের নমুনা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অন্তত ২০ মিনিট বিশ্রামে রাখতে হয়। এরপর জীবাণুমুক্ত পদ্ধতিতে ৫ থেকে ১০ মিলিলিটার রক্ত সংগ্রহ করে বিশেষ রক্ত-সংরক্ষণ নলে রাখতে হয়।
লালার নমুনা দেওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে থেকে খাবার ও পানীয় গ্রহণ বন্ধ রাখতে হয়। বিশেষ নমুনা-সংগ্রাহক দণ্ড মুখের ভেতরে দুই গালের পাশে চার থেকে আটবার ঘুরিয়ে নমুনা নিতে হয়।
চুলের ক্ষেত্রে মাথা বা শরীরের নির্ধারিত অংশ থেকে অন্তত ১০টি চুল সংগ্রহ করে পরিষ্কার কাগজে মুড়ে সিল করা খামে রাখতে হয়। নখের ক্ষেত্রে হাতের একটি ও পায়ের একটি নখের অংশ নিয়ে মোট দুটি নমুনা সংগ্রহের নিয়ম রয়েছে।
এসব নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হলো নমুনাটি কার, কখন নেওয়া হয়েছে এবং পরীক্ষাগারে পৌঁছানো পর্যন্ত তা অক্ষত ছিল কি না, সেই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।
ডোপ টেস্টের ফল কেবল ‘ইতিবাচক’ বা ‘নেতিবাচক’—এই দুই শব্দে বিচার করলে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা থেকে যায়। একটি পরীক্ষার ফলাফল সঠিকভাবে বুঝতে হলে জানা দরকার, কোন নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, কোন মাদকের জন্য পরীক্ষাটি করা হয়েছে এবং সেবনের কত দিন পর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। শুধু পরীক্ষা করলেই যথেষ্ট নয়; যে সময়ের মাদক সেবনের তথ্য জানতে চাওয়া হচ্ছে, সেই সময়ের উপযোগী নমুনা যথাসম্ভব দ্রুত সংগ্রহ করা প্রয়োজন। দেরি হলে পরীক্ষাটি যথাযথভাবে সম্পন্ন হলেও, যে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে, তার উত্তর নমুনায় আর নাও থাকতে পারে।
Hi, this is a comment.
To get started with moderating, editing, and deleting comments, please visit the Comments screen in the dashboard.
Commenter avatars come from Gravatar.