কাউকে লক্ষ্য করে ডিম ছুড়ে মারা প্রথম দেখায় আকস্মিক বা হঠকারী আচরণ মনে হতে পারে। তবে এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস। বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে এটি কেবল ক্ষোভ প্রকাশের একটি উপায়ই নয়, বরং প্রতীকী অপমান ও প্রতিবাদের একটি নির্দিষ্ট ভাষা হয়ে উঠেছে।
ডিম ছোড়ার ইতিহাস
প্রাচীন গ্রিস ও রোমে জনসমক্ষে কাউকে অপমান করার ধারণাটি ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অপছন্দের শাসক, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা কিংবা সমাজবিরোধী কোনো ব্যক্তিকে হেয় করতে তখন মাঝেমধ্যে পচা ফল, সবজি বা ডিম ছোড়া হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল শারীরিক ক্ষতি নয়, বরং সম্মানহানি ও সামাজিক লজ্জা দেওয়া।
খ্রিষ্টপূর্ব ৬৯ অব্দে রোমান শাসক ভেসপাসিয়ান তাঁর কর নীতির কারণে জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন এবং তাঁকে লক্ষ্য করে শালগম ছোড়া হয়েছিল।
ডিম ছোড়ার সুনির্দিষ্ট লিখিত রেকর্ড পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে এশিয়া মাইনরের কবি হিপোনাক্সের রচনায়। তিনি লিখেছিলেন, সমাজচ্যুত বা অপরাধী ব্যক্তিদের ওপর ডিম বা পচা খাবার ছুড়ে মেরে তাঁদের সামাজিকভাবে হেয় করা হতো।
এলিজাবেথান যুগে, অর্থাৎ শেক্সপিয়রের সময়ে, দর্শক কোনো অভিনেতার অভিনয় পছন্দ না করলে তাঁর দিকে পচা ডিম ছুড়ে মারতেন।
বিখ্যাত লেখিকা জর্জ এলিয়ট তাঁর ‘মিডলমার্চ’ উপন্যাসে, যার প্রেক্ষাপট ছিল ১৮৩০-এর দশক, নির্বাচনের সময় ডিম ছোড়ার একটি দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, সেই সময়েও এটি রাজনৈতিক প্রতিবাদের একটি স্বীকৃত মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।
মধ্যযুগীয় ইউরোপে ‘চারিভারি’ নামে পরিচিত এক ধরনের গণ-উপহাসের রীতি প্রচলিত ছিল। সমাজ যাঁদের আচরণ অনৈতিক বা অগ্রহণযোগ্য মনে করত—যেমন অনিচ্ছাকৃত বা অসম বিয়ে, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি কিংবা সামাজিক রীতি ভাঙা কেউ—তাঁদের বাড়ির সামনে গিয়ে জনতা হাঁড়ি-পাতিল, কড়াই বা ড্রাম পিটিয়ে বিকট ও কর্কশ শব্দ তৈরি করত।
এই বিশৃঙ্খল শব্দের মাধ্যমে মূলত ওই ব্যক্তিকে জনসমক্ষে লজ্জা দেওয়া ও অপমান করা হতো। অনেক সময় এই হট্টগোলের মধ্যেই পচা ডিম বা ময়লা ছোড়া হতো। এক অর্থে এটিও ছিল উচ্ছৃঙ্খল জনতার নিজের হাতে বিচার তুলে নেওয়ার একটি রূপ।
মধ্যযুগে কোনো অপরাধীকে যখন কাঠের ফ্রেমে হাত-পা আটকে জনসমক্ষে রাখা হতো (পিলরি নামে পরিচিত এই শাস্তি), তখন সাধারণ মানুষ তাঁদের ওপর পচা ডিম ছুড়ে মারত। এটিই মূলত আধুনিক ‘এগিং’ বা ডিম ছোড়ার প্রাতিষ্ঠানিক রূপের সূচনা বলে মনে করা হয়।
আধুনিক যুগে ডিম ছোড়ার ঘটনা
আধুনিক যুগে ডিম ছোড়া একটি সুপরিচিত রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। ২০০১ সালে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকটের ওপর ডিম ছোড়ার ঘটনাটি ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ‘এগিং’ ঘটনা হিসেবে পরিচিত।
যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ১৯৯০ সালের নির্বাচনী প্রচারে এবং তারও আগে লেবার পার্টি ও ছাত্র আন্দোলনের সময় ডিম হামলার শিকার হয়েছিলেন। ১৯৯২ সালের মে মাসে সাউদাম্পটনে এক নির্বাচনী প্রচারণার সময় যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজরের মুখে সরাসরি একটি ডিম এসে লাগে।
রাজপরিবারের সদস্য হয়েও রাজা তৃতীয় চার্লস একাধিকবার এই বিড়ম্বনার মুখে পড়েছেন। ২০২২ সালের ৯ নভেম্বর রাজা হওয়ার পর চার্লস ও কুইন কনসোর্ট ক্যামিলা যখন ইয়র্কের ঐতিহাসিক ‘মিকলগেট বার’ দিয়ে শহরে প্রবেশ করছিলেন, তখন ২৩ বছর বয়সী এক যুবক তাঁদের লক্ষ্য করে কয়েকটি ডিম ছোড়েন। ডিমগুলো রাজার খুব কাছ দিয়ে গিয়ে মাটিতে পড়ে ভেঙে যায়। ওই যুবক চিৎকার করে বলছিলেন, ‘এই দেশ দাসের রক্ত দিয়ে গড়া।’
ইয়র্কের ঘটনার প্রায় এক মাস পর, ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর লুটন টাউন হলের সামনে জনসাধারণের সঙ্গে হাত মেলানোর সময় ২১ বছর বয়সী আরেক তরুণ রাজাকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়েন।
লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিটে টিউশন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করার সময় তৎকালীন প্রিন্স চার্লস ও ক্যামিলার রাজকীয় গাড়ি বিক্ষোভকারীদের মুখে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা গাড়িতে ডিম ছোড়েন, লাথি মারেন এবং গাড়িতে সাদা রং ছিটিয়ে দেন; এতে গাড়ির একটি জানালাও ভেঙে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৩ সালে আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের ওপর ডিম ছোড়া হয়েছিল। সে সময় তিনি রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার বিশেষ ‘রিকল’ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের সময়ও যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতিবিদদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনা ঘটেছিল। জার্মানি, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়াতেও বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এমন ঘটনার নজির রয়েছে।
এসব ঘটনায় ডিম ছোড়া মূলত একটি নির্দিষ্ট বার্তা দেওয়ার মাধ্যম—আমরা তোমার ক্ষমতা মানছি না, তোমাকে সম্মানও দিচ্ছি না।
কেন ডিমই বেছে নেওয়া হয়
ডিম ছোড়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ও ব্যবহারিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি মারধরের মতো গুরুতর সহিংসতা নয়—গায়ে লাগলেও শারীরিক ক্ষতি হয় না। তবে ডিমের দুর্গন্ধ ও আঠালো ভাব ভুক্তভোগীর আত্মমর্যাদাকে মুহূর্তেই ম্লান করে দেয়। দ্বিতীয়ত, ডিম প্রায় সব জায়গাতেই সহজলভ্য ও সস্তা।
এই কারণগুলোর জন্য সমাজবিজ্ঞানীরা ডিম ছোড়াকে প্রায়ই ‘প্রতীকী সহিংসতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন—এখানে শারীরিক আঘাতের চেয়ে সামাজিক অপমানই মুখ্য বিষয়।